বিলাতি ধনিয়া বা বাংলা ধনিয়া বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য অঞ্চলের একটি অন্যতম লাভজনক অর্থকরী মসলা ফসল। এ ধনিয়ার পাতা ও কচি পুষ্পপদণ্ড একাধারে সবজি, সালাদ এবং মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিলাতি ধনিয়া প্রধানত খরিফ মৌসুমের ফসল। এর পাতা ও কচিকাণ্ড পাকস্থলীর প্রদাহরোধী এবং এনালজেসিক হিসেবে কাজ করে। এটি ক্ষুধা উদ্রেককারী, হজমশক্তি বাড়ায়, পাকস্থলীর ব্যাথা উপশম, ডাইরিয়া, শাস, পোকা সাপের কামড় কমায়, কোলিক সমস্যা দূর করে এবং গ্যাস উদগীরন কমায়। এ ফসলটির পুষ্টি গুণাগুণ অত্যন্ত উচ্চমানের। এর পাতা ও কাণ্ডে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, আয়রন, ক্যারোটিন এবং রিবোফ্লাভিন রয়েছে। এসব উদ্বায়ী সুগন্ধি তৈল জাতীয় পদার্থ এবং এসিড জাতীয় উপাদান সংগ্রহ করে উচ্চমুল্যর সুগন্ধি ও ভেষজ ওষুধ তৈরি করা যায়। চীনারা সর্বপ্রথম ধনিয়ার বিকল্প হিসেবে বিলাতি ধনিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রচলন করেন। বর্তমানে বিলাতি ধনিয়া বাংলাদেশ ছাড়াও ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়া, চীন প্রভৃতি দেশে চাষ হচ্ছে।

 

ভেষজগুণ:

জ্বর, হাইপার টেনশন, অ্যাজমা, পাকস্থলীর জ্বলা পোড়া, কৃমি, সাপে কামড়ানো, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় বিলাতি ধনিয়া সফলভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

 

বিলাতি ধনিয়া এবং ধনে পাতার পার্র্থক্য: বিলাতি ধনিয়া এবং ধনে পাতার মধ্যে কোন সাদৃশ্য নেই। বিলাতি ধনিয়া দেখতেও ধনে পাতার মতো নয়। ধনে পাতা পাতলা ও চতুদিকে চেরাচেরা। বিলাতি ধনিয়ার পাতা লম্বা, কয়েকটি পাতা মিলে একটি গোছা বা গাছ হয়। পাতার চারদিকে নরম কাঁটা থাকে। ধনে পাতার গাছে কান্ড হয়। কিন্তু বিলাতি ধনিয়াতে কোন কান্ড হয় না।

 

জমি তৈরি :

বিলাতি ধনিয়া চাষের জন্য খুব ভালোভাবে জমি প্রস্তুত করা প্রয়োজন। ৫/৬টি চাষ ও উপর্যুপরি মই দিয়ে মাটির ঢেলা ভেঙে ঝুরঝুরা করা প্রয়োজন। কেননা বিলাতি ধনিয়ার বীজ খুব ক্ষুদ্রাকৃতির বালির দানার মতো ছোট হওয়ায় বড় আকারের ঢেলার মধ্যে গজানো সম্ভব  নয়। এজন্য মটরদানা বা  মার্বেলের চেয়ে বড় আকারে ঢেলা থাকা ঠিক না। বীজ বপনের আগে মাটিতে প্রয়োজনীয় রস বা জো অবস্থা থাকা খুব প্রয়োজন। প্রয়োজনে বপনের আগে একবার হালকা সেচ দেয়া যেতে পারে। তবে নভেম্বর ডিসেম্বর মাসে অধিকাংশ মাটিতে প্রয়োজনীয় রস থাকে। এক মিটার চওড়া বেড, জমির সমান লম্বা এবং ৩০ সেন্টিমিটার চওড়া নালা  রাখা প্রয়োজন। এ নালার মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরিচর্যা, পানি সেচ ও নিষ্কাশনের কাজ সহজ হয়।

বীজ বপন :

নভেম্বর থেকে জানুয়ারি বা অগ্রহায়ণ-পৌষ  মাস বিলাতি ধনিয়ার বীজ বপনের উত্তম সময়। মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকলে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত বপন করা যায়। তবে বীজ বপনের পরেও অন্তত ২০-২৫ দিন কম তাপমাত্রা থাকা প্রয়োজন। কেননা বিলাতি ধনিয়া বীজের অঙ্কুরোদগমের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা হলো ১০-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে এর গজানো হার কমে আসে। বিলাতি ধনিয়ার বীজে এক মাসের বেশি সাধারণ অবস্থায় অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা থাকে না। এজন্য বীজ সংগ্রহের পর যত শিগগির সম্ভব হালকাভাবে ছায়াতে শুকিয়ে বপন করা উচিত। বিলাতি ধনিয়ার ক্ষুদ্রাকৃতির বীজ সমানভাবে বোনা বেশ কষ্টকর এবং বিশেষ দক্ষতারও প্রয়োজন। তাই বালির সাথে মিশিয়ে বীজ বোনা ভালো।  ১০-১৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে সারিতে অথবা ছিটিয়ে বীজ বপন করা য়ায় । গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি হেক্টরে ৩৫ থেকে ৪০ কেজি হারে বা প্রতি বর্গমিটারে ৪ গ্রাম অর্থাৎ প্রতি শতাংশ জমিতে ১৬০ গ্রাম বীজ বপন করে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়। ছিটিয়ে বপনের ক্ষেত্রে বীজ বপনের পর মাটি ওপরের স্তরের ১-১.৫ সেন্টিমিটার গভীরতা পর্যন্ত মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। লাইনে বপন করলে ১.৫-২.৫ সেন্টিমিটার গভীর নালা করে নালাতে লাইন করে বীজ ছিটিয়ে  দুই পাশে মাটি দিয়ে হালকাভাবে ঢেকে দিতে হবে। অতি ক্ষুদ্রাকৃতির বীজ হলেও প্রতি শতাংশে ১৫০ থেকে ১৬০ গ্রাম বীজ আপাত দৃষ্টিতে অনেক বেশি বলে মনে হয়। কিন্তু এর সব বীজ এক সাথে গজায় না। কয়েক মাস পর্যন্ত বীজ ক্রমান্বয়ে গজাতে থাকে। একই দিনে বোনা বীজ গজাতে ১৫-১২০ দিন পর্যন্ত সময় নেয়।  ফলে একবার বীজ বপন করেও কৃষক অনেক বার মানে অন্তত ৮-১২ বার ফসল তুলতে পারেন।

সার প্রয়োগ ও পরিচর্যা:

বিলাতি ধনিয়া ‘পাতা জাতীয়’ ফসল হওয়ায় এই ফসলে ইউরিয়া ও পটাশ সার বেশী লাগে। বীজ বোনার পূর্বে প্রতি শতাংশে জমিতে ৮০ কেজি পঁচা গোবর বা আবর্জনা পঁচা সার, ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৮০০ গ্রাম টি এস পি ও ৮০০-১০০০ গ্রাম এম ও পি সার শেষ চাষের ৩-৪ দিন আগে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। চারা গজানোর পর থেকে ১ মাস অন্তর অথবা ২ বার ফসল সংগ্রহের পর প্রতি শতাংশে ২০০ গ্রাম হারে ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করতে হবে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে ছায়াযুক্ত স্থানে ইউরিয়া বেশি দিলে পাতায্ক্তু গাছের ফলন বাড়ে।

 

বিবিধ ব্যবস্থাপনা:

ক. আগাছা দমনঃ

চারা গজানোর পর সাধারণত ১ বার আগাছা পরিস্কার করলেই চলে। তবু জমিতে যেন আগাছা জন্মাতে না পারে একটু সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়াজন। ক্রমে ফসল বড় হয়ে মাঠ ছেয়ে গেলে তখন আগাছা নিড়ানোর প্রয়োজন হয়না।

খ. ছাউনি দেয়াঃ

ছাউনি না দিলে প্রখর সূর্যালোকের কারণে বিলাতি ধনিয়ার পাতা শক্ত ও কাঁটাযুক্ত হয়ে যায়। আবার সূর্যালোক না পাইলে ফসল ভাল হয় না। মোট সূর্যালোকের ২০-৪০ ভাগ বিক্ষিপ্ত আলো বিলাতি ধনিয়ার জন্য যথেষ্ট। এজন্য বাঁশের তৈরি মাচায় নারিকেল পাতা, ছন, ধৈঞ্চা, কলাপাতা ইত্যাদি দিয়ে ছাউনি করা ভালো। এ ছাড়া মাচায় কুমড়া জাতীয় আন্ত:ফসল তুলে দিলে বাড়তি ফসল পাওয়া যাবে।

গ. সেচ প্রদানঃ

বিলাতি ধনিয়া আর্দ্রতা বেশি পছন্দ করে। তাই এ ফসলে জমিতে সব সময় রস থাকতে হবে। তবে জলাবদ্ধতা হতে দেয়া যাবে না। ঝরণা সেচ ৭ দিন পর পর দিলে সবচেয়ে ভালো।

ঘ. বালাই দমনঃ

বিলাতি ধনিয়ায় সাধারণত তেমন রোগ ও পোকার আক্রমণ হয় না। তবে মাঝে মাঝে গোড়া পঁচা  রোগ ও পাতা ঝলসানো ছত্রাকজনিত রোগ দেখা দিতে পারে। অনুমোদিত  ছত্রাকনাশক দিয়ে এ রোগ দমন করতে হবে।

ঙ. ফসল সংগ্রহ ও বিপণনঃ

কাঁচা পাতার ফলন হেক্টরে প্রায় ৩৫-৪৭ টন। গাছ বড় হতে শুরু করলে অর্থাৎ সবুজপাতা যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন বড় গাছগুলোর গোড়াসহ ওঠিয়ে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে আঁটি বেঁধে অথবা স্তুপাকারে প্লাষ্টিকের ক্যাইসে (বাক্স) ভরে বাজারে প্রেরণ করতে হবে। এর চাহিদা বেশি থাকায় পাইকারগণ জমি থেকেই ফসল ক্রয় করে থাকেন। ক্ষুদ্র চাষিগণ পূর্নতাপ্রাপ্ত পাতা গাছ থেকে ধারালো যন্ত্রের সাহায্যে কেটে ছোট ছোট আঁটি বেঁধে পাইকার বা বিক্রেতার/ ক্রেতার কাছে বিক্রি করে থাকেন।

বিলাতি ধনিয়ার গাছে ফুল ফোটার ৪০ দিনের মধ্যে বীজ পেকে যায়। বেশি পাকতে দিলে বীজ ঝরে যায়। এ জন্য বেশি না পাকিয়ে কেটে এনে প্লাষ্টিকের বিছানার উপর রেখে শুকাতে হবে। দন্ড শুকানোর পর মাড়াই না করেও মঞ্জুরী দন্ডসহ ফুল শুকিয়ে পলিব্যাগ বা কৌটায় ভরে রাখা যাবে। চাষের পূর্বে বীজ বুনার আগে মাড়াই করে বীজ বুনতে হবে।

 

 

 

৫। অনলাইনে বীজ কোথায় পাওয়া যায়ঃ

দোকানের পাশাপাশি এখন অনলাইনে বীজ কিনতে পারবেন। কিনতে নিচে বীজ লেখা লিঙ্কের উপর ক্লিক করুনঃ

বীজ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *