পুকুরে শিং মাছের চাষ পদ্ধতি

2nd November 2019 0 Comments

পুকুরে শিং মাছ চাষ একটি লাভজনক ব্যবসা। ভালো করে চাষ করতে পারলে কার্পজাতীয় মাছের তুলনায় শিং মাছ চাষে লাভ বেশি। তাছাড়া কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমেও পর্যাপ্ত পরিমাণে দেশি শিং মাছের পোনা উৎপাদন এবং চাষ করা সম্ভব। কেননা শিং মাছ বাজারের একটি দামি মাছ। কথায় আছে, শিং মাছ খেলে দ্রুত রক্ত বৃদ্ধি হয়। তাহলে জেনে নিন কীভাবে চাষ করবেন।

 

পুকুর নির্বাচন:

১. পুকুর অবশ্যই বন্যামুক্ত হতে হবে।

২. পুকুরের পাড় মজবুত হতে হবে। কোন প্রকার ছিদ্র থাকলে সমস্ত- শিং মাছ চলে যাবে।

৩. বর্ষাকালে বৃষ্টির সময় পানির উচ্চত ৪ ফুটের বেশি হবে না এই জাতীয় পুকুর নির্বাচন করতে হবে।

৪. চাষের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে, শিং মাছের পুকুর আয়তাকার হলে ভাল ফল পাওয়া যায়। বর্গাকার একটি পুকুরের চেয়ে আয়তাকার পুকুরে একই হারে খাদ্য ও ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে ১০ ভাগ বেশি উৎপাদন হয়।

৫. পুকুরের আয়তন ৪০/৫০ শতাংশের মধ্যে হতে হবে এবং পুকুরের এক প্রান্ত- অন্য প্রান্তের চেয়ে ১ ফুট ঢালু রাখতে হবে যাতে মাছ ধরার সুবিধাসহ পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা যায়।

 

পুকুর প্রস্তুত:

নতুন ও পুরাতন উভয় ধরনের পুকুরে শিং মাছ চাষ করা যায়। তবে নতুন পুকুরের চেয়ে পুরাতন পুকুরে শিং মাছ চাষ ভাল হয়। নতুন পুকুরে শিং মাছ চাষ করলে পুকুর ভালভাবে চাষ দিয়ে প্রতি শতাংশে কমপক্ষে ২০ কেজি গোবর ও ভালভাবে মই দিয়ে তারপর চুন দিতে হবে। তাতে মাটির উর্বরতা বাড়বে। শিং মাছের পুকুর উর্বর না থাকলে অনেক সময় শিং মাছ মজুতের পর পোনা আঁকাবাঁকা হয়ে যায়। পুরাতন পুকুরে শিং মাছ চাষের জন্য প্রথমেই সেচ দিয়ে শুকিয়ে ফেলতে হবে। পুকুরের তলায় বেশি কাদা থাকলে উপরের স্তরের কিছু কাদা উঠিয়ে ফেলতে হবে। এরপর চুন দিতে হবে শতাংশ প্রতি ১ কেজি। তারপর পুকুরের চারদিকে জাল দিয়ে ভালভাবে ঘের দিতে হবে। এতে কোন সাপ বা ব্যাঙ পুকুরে ঢুকতে পারবে না। ব্যাঙ বেশি ক্ষতিকর না হলেও সাপ শিং মাছের জন্য খুবই ক্ষতিকর। শিং পোনার চলার ধীর গতির কারণে সাপ অনেক পোনা খেয়ে ফেলতে পারে। চারপাশে জাল দেয়ার পর পুকুরে শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে ২ থেকে ৩ ফুট পরিষ্কার পানি দিতে হবে। পানি দেয়ার ২/৩ দিনের মধ্যে পোনা ছাড়তে হবে। পোনা ছাড়ার পর এক ইঞ্চি ফাঁসের একটি জাল পেতে রাখতে হবে তাতে পুকুরের ভেতর কোন সাপ থাকলে ওই জালে আটকা পড়বে।

 

পোনা মজুদ:

পুকুর প্রস্তুতের পর গুণগতমানের পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারি থেকে প্রায় ২ ইঞ্চি সাইজের পোনা মজুদ করতে হবে। আজকাল পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ার কারণে অনেক হ্যাচারিই শিং মাছের পোনা উৎপাদন করে। কিন্তু পোনাকে কীভাবে মজুদ করলে পোনার মৃত্যহার কম হবে বা আনুসাঙ্গিক ব্যবস্থাপনা কি হবে তা অধিকাংশ হ্যাচারিই না জানার কারণে শিং মাছের পোনা মজুদের পর ব্যাপকহারে মড়ক দেখা দেয়। প্রথমে যা করতে হবে তা হল, হ্যাচারিতে পোনা তোলার পর কন্ডিশন করে এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসল দিয়ে তারপর পোনা ডেলিভারি দিতে হবে। পোনা পরিবহনের পর এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসল দিয়ে পুকুরে ছাড়তে হবে। আর তা না হলে পুকুরে ছাড়ার পর পোনা ক্ষতরোগে আক্রান্ত- হতে পারে। পুকুরে পোনা ছাড়ার ২/৩ দিন পর আবার একই জাতীয় ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। এতে শিং মাছের পোনা মজুদের পর আর কোন রোগবালাই আসবে না। মজুদ

 

ঘনত্ব :

শিং মাছ এককভাবে বা মিশ্রভাবে চাষ করা যায়। মিশ্রভাবে চাষ করতে হলে কার্প জাতীয় মাছের সাথে প্রতি শতাংশে ৩০টি পর্যন্ত- আঙ্গুল সাইজের শিং মাছের পোনা ছাড়তে হবে। পোনা মজুদের সময় পোনাকে এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসল দিয়ে তারপর পুকুরে ছাড়তে হবে। কার্প জাতীয় মাছ ছাড়া তেলাপিয়া এবং পাঙ্গাসের সাথেও শিং মাছের মিশ্রচাষ করা যায়। সে ক্ষেত্রে প্রতি শতাংশে ৫০টি পর্যন্ত- শিং মাছের পোনা মিশ্রভাবে ছাড়া যায়। কার্প জাতীয়, তেলাপিয়া বা পাঙ্গাসের সাথে শিং মাছ চাষ করলে বাড়তি খাবারের প্রয়োজন হয় না। পুকুরের তলায় উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়েই এরা বড় হয়ে থাকে। উপরোন্ত- এই জাতীয় মাছের পুকুরে শিং মাছ মিশ্রভাবে চাষ করলে পুকুরে অ্যামোনিয়াসহ অন্যান্য গ্যাসের কম হয়। একক চাষে শিং মাছ প্রতি শতাংশে ৫০০ থেকে ১০০০ টি পর্যন্ত ছাড়া যায়। শীতকালে শিং মাছ চাষের জন্য

 

করণীয় :

শীতকালে শিং মাছের রোগবালাই থেকে রক্ষার জন্য প্রতি ১৫ দিন অন্তর অন্তর পুকুরের পানি পরিবর্তন করতে হয়। সাথে প্রতি মাসে একবার এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিন দেয়া দরকার। পানির উচ্চতা ২ ফুটে রাখা বাঞ্চনীয়। গ্যাস দূর করতে কোন অবস্থাতেই শিং মাছের পুকুরে হররা টানা যাবে না। এতে শিং মাছ খাবার ছেড়ে দিয়ে আরো বেশি গ্যাসের সৃষ্টি করবে। নিচের অ্যামোনিয়া গ্যাস দূর করতে গ্যাসোনেক্স ব্যবহার করা যেতে পারে। এক হেক্টর আয়তনের পুকুরে শিং-মাগুর চাষের জন্য বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব (১) পুকুর শুকানো/মাছ মারার ওষুধ ৪,০০০ টাকা, (২) চুন ২৫০ কেজি মূল্য ২,০০০ টাকা, (৩) জৈব সার ২,০০০ কেজি মূল্য ২,০০০ টাকা, (৪) ইউরিয়া ২৫০ কেজি মূল্য ২,০০০ টাকা, (৫) টিএসপি ১২৫ কেজি মূল্য ১,৮৭৫ টাকা, (৬) এমপি ১০০ কেজি মূল্য ৭০০ টাকা (৭) সম্পূরক খাদ্য ৩,৬০০ কেজি মূল্য ৫৪,০০০ টাকা, (৮) মাছের পোনা (৪-৬ সে.মি.) ২৫০০০ টি মূল্য ৩৭,০০০ টাকা, (৯) ওষুধ ও রাসায়নিক গুচ্ছ মূল্য ১,০০০ টাকা, (১০) মাছ আহরণ ও বাজারজাতকরণ গুচ্ছ মূল্য ৪,৫০০ টাকা, (১১) বিবিধ ১,৪০০ টাকা। মোট ব্যয় ১,১০,৪৭৫ টাকা। পুকুর ভাড়া এবং ব্যাংক ঋণ নিয়ে চাষ করলে ২৮,০০০ টাকা বেশি ব্যয় হবে। উপাদন ও আয় : উৎপাদন : ১,৮০০ কেজি মাছ। আয় : প্রতি কেজি ১২৫ টাকা হিসেবে ১,৮০০ কেজির মূল্য ২,২৫,০০০ টাকা। মুনাফা : ২,২৫,০০০ থেকে ১,১০,৪৭৫ টাকা = ১,১৪,৫২৫/- টাকা। টাকার হিসাব সমূহ সময়ের সাথে সম্বনয় করে নিতে হবে এ ফিচারটি আপনাকে সাধারণ ধারণা দেয়ার উদ্যেশ্যে লেখা হয়েছে।

 

 

অনলাইনে মাছের পোনা কোথায় পাওয়া যায়ঃ

হ্যাচারীর পাশাপাশি এখন অনলাইনেও অর্ডার করে কিনতে পারবেন যে কোন মাছের পোনা । মাছের পোনা কিনতে ক্লিক করুন নিচে দেয়া মাছের পোনা লেখার উপর।

মাছ

Leave a Comment

Your email address will not be published.