ডালিয়া ফুল চাষ

ডালিয়া ফুল চাষ
 
ডালিয়া এক ধরনের গুল্মজাতীয়, কন্দযুক্ত, সপুষ্পক ভেষজ বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ যা মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকায় জন্মায়। ডিকোটাইলেডোনাস (dicotyledonous) উদ্ভিদের অস্টেরেসি (Asteraceae) (পূর্বে কম্পোজিটি (Compositae)) পরিবারের সদস্য হিসাবে বাগানে সূর্যমুখী, ডেইজি, চন্দ্রমল্লিকা এবং জিনিয়া ফুলের পাশাপাশি ডালিয়ার চাষ করা হয়। শীতকালীন মৌসুমী ফুলের মধ্যে ডালিয়াই সর্ববৃহৎ আকার ও আকর্ষণীয় রঙের ফুল। ডালিয়ার ৪২টি প্রজাতি রয়েছে, সাধারণত সংকর প্রজাতিগুলি বাগানের গাছ হিসাবে দেখা যায়। ডালিয়া ফুলের গঠন পরিবর্তনশীল, যেখানে প্রতি ডাঁটায় একটি করে মাথা থাকে, এগুলি ৫ সেমি (২ ইঞ্চি) ব্যাসের মতো বা ৩০ সেমি (১ ফু) (“ডিনার প্লেট”) পর্যন্ত হতে পারে।


১৯৬৩ সালে ডালিয়া মেক্সিকোর জাতীয় ফুল হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। ডালিয়া ফুলের কন্দগুলি আজটেকদের খাদ্য শস্য হিসাবে জন্মেছিল, তবে স্প্যানিশ বিজয়ের পরে এই প্রচলন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কমে গিয়েছিল। ইউরোপে খাদ্য শস্য হিসাবে ডালিয়ার কন্দগুলি প্রবর্তনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল।

ভৌগলিক অবস্থা
এ ফুলের আদি বাসস্থান মেক্সিকোর গুয়াতেমালায়। বাংলাদেশের খুবই জনপ্রিয় ফুল।

 
জাত

ডালিয়ার ১০ টি শ্রেণীর আওতায় এর প্রচুর জাত রয়েছে। ডালিয়ার উন্নত জাতের মধ্যে রয়েছে সিঙ্গল আমাদের দেশে শীতে অনেক বাগানে দেখা যায়। এছাড়াও আছে স্টার, অ্যানেমিন ফাওয়ার্ড, কলারেট, পিওনি ফাওয়ার্ড, ফরমাল ডেকোরেটিভ ইত্যাদি।
ডেকোরেটিভ ডালিয়া
ফুল সজোর, পাপড়িগুলো চ্যাপ্টা হয়, মাঝখানের চাকতিটি প্রায় দেখাই যায় না। এদের বড় জাতের ফুল ২০ সেমির বেশি চওড়া, মাঝারিগুলি ১৫-২০ সেমি চওড়া, ছোটগুলি ১৫-১০ সেমি।

 

ক্যাকটাস ডালিয়া

ফুল সজোর, মাঝখানের চাকতিটি ঢাকা থাকে প্রান্ত- পুষ্পিকাগুলি সোজা, বিকীর্ণ, কিছুটা মোরানো বা তারার মত। বড় জাতের ফুল ২০ সেমি চওড়া, মাঝারিগুলি ১৫-২০ সেমি চওড়া, ছোটগুলি ১০-১৫ সেমি।
 
মাটি ও জলবায়ু : সুনিষ্কাশিত উর্বর দোআঁশ মাটি বা বেলে দোআঁশ প্রকৃতির ঈষৎকার মাটি ডালিয়া চাষের জন্য উত্তম। ছায়াযুক্ত স্থানে গাছ দুর্বল ও লম্বা হয়, ফুল কম ও ছোট হয় এবং রঙের ঔজ্জ্বল্য হ্রাস পায়। ফলে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় এমন জমিতে ডালিয়ার চাষ করতে হবে। ডালিয়া বৃপ্রেমীরা যারা চাষ করবেন তাদেরকে আবহাওয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। যে দিন বৃষ্টি হবে সে দিন থেকে যত দিন পর্যন্ত মাটি স্যাঁতসেঁতে থাকবে তত দিন পানি দেয়ার দরকার নেই। আবার গরমের সময়ে মাটি যখন শুকনো হয়ে ওঠে তখন পানির পরিমাণ বাড়িয়ে মাটি আর্দ্র করে তুলতে হবে। কারণ ডালিয়াগাছের জন্য আর্দ্র মাটি প্রয়োজন। তবে মাটি বেশি ভিজে কাদাকাদা হয়ে গেলে তা গাছের পে তেমন উপকারী হবে না, টবের গাছের ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থা করা উচিত। বৃষ্টির সময়ে গাছের ওপর ছাউনি দিতে পারলে ভালো কিংবা কোনো ছাউনির নিচে রাখলে গাছ নিরাপদে থাকবে। টবের গাছের ক্ষেত্রে প্রতিদিন নিয়ম করে পানি দিয়ে মাটিকে আর্দ্র রাখা উচিত।
 

বংশ বিস্তার : ডালিয়া বীজ, মূলজ কন্দ, ডাল কলম এবং ত্রেবিশেষে জোড় কলমের সাহায্যে বংশ বিস্তার করে। মূলজ কন্দ ও ডাল কলম থেকে চারা তৈরির পদ্ধতি হলো ডালিয়াগাছের গোড়ায় জন্মানো মূলজ কন্দ পরবর্তী বছর চারা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে ফুল শেষে গাছ নিস্তেজ হয়ে পাতা ও ডাঁটা শুকিয়ে আসলে কন্দ পরিপক্ব ও সংগ্রহ উপযোগী হয়। মাটির নিচ থেকে অত অবস্থায় কন্দ তুলে দু-এক দিন বাতাসে শুকিয়ে আলুর মতো শুষ্ক বালুতে সংরণ করতে হয়। অতঃপর ভাদ্র-আশ্বিন মাসে কন্দগুলোকে অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক বালু মিশ্রিত বীজতলা বা টবে রোপণ করে সামান্য পানি সিঞ্চন করলে কয়েক দিনের মধ্যে কন্দের চোখ থেকে নতুন চারা বের হয়। চারা দুই থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার লম্বা হলে মূলজ কন্দটিকে চারাসহ কেটে টুকরো করে নির্ধারিত জমিতে বা টবে রোপণ করা চলে। অপর দিকে আশ্বিন থেকে অগ্রহায়ণ মাসে ডালিয়ার ডাল কলম করা যায়। এ সময়ে মূলজ কন্দে জন্মানো কচি চারা বা ডাল থেকে গিটসহ কেটে বা ভেঙে নিতে হয়। তা ছাড়া পুষ্ট কন্দ বা কাণ্ডের পাশে জন্মানো ১৫-২০ সেন্টিমিটার লম্বা পুষ্ট ডাল ও গিটসহ সংগ্রহ করা চলে।

সার প্রয়োগ : বাংলাদেশের পরিবেশে আশ্বিন থেকে অগ্রহায়ণ পর্যন্ত সময়ে জমিতে কিংবা টবে ডালিয়ার চারা রোপণ করা যায়। ডালিয়ার মাটি গভীরভাবে নরম ও ঝরঝরে করে তৈরি করতে হয়। প্রতি ১০০ বর্গ মিটার জমিতে ২০০ কেজি গোবর, তিন কেজি কাঠের ছাই ও দুই কেজি টিএসপি সার মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হয়। ভারী মাটিতে গোবরের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া উত্তম। টবে ডালিয়া চাষের জন্য ২ ভাগ দোআঁশ মাটি, ২ ভাগ বালি, ২ ভাগ কাঠের ছাই, ১ ভাগ পাতা পচা সার, ১ ভাগ গোবর, ১ ভাগ খৈল ও ১ ভাগ টি এস পি সার মিশিয়ে মাটি তৈরি করতে হয়।

চারা রোপণ ও পরিচর্যা : ডালিয়া চাষের জমিতে জাত ভেদে ৬০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার দূরত্বে সারিবদ্ধভাবে আর প্রতি টবে একটি চারা রোপণ করতে হয়। টবের আকার ২৫ সেন্টিমিটার হলে ভালো হয়। চারা লাগানোর পর থেকে গাছে এমনভাবে সেচ দিতে হয় যাতে কখনো পানির ঘাটতি না পড়ে ও জলাবদ্ধতা দেখা না দেয়। ডালিয়াগাছে সাধারণ রেড স্পাইডার ও রেড মাইভ ধরনের পোকা হয়। এই পোকা থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় হলো প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে ক্যালিথিন বা নোবাকন নামে ওষুধের ২০ ফোঁটা এক লিটার পানিতে ভালো করে গুলিয়ে সেই মিশ্রণ দিয়ে ঝারির সাহায্যে গাছগুলোকে ভিজিয়ে দেয়া যায়, তাহলেই এ ধরনের পোকার আক্রমণ থেকে গাছকে রা করা সম্ভব হবে। ।

Leave a Comment

Your email address will not be published.