জাম

28th December 2019 0 Comments

জাম (Java plum, Jambul, Malabar plum) একটি চিরসবুজ ফলদ বৃক্ষ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium cumini। এটি Myrtaceae পরিবারভুক্ত একটি ফল।এর সংস্কৃত নাম জম্বু, জম্বুফল। এবং সমার্থক বাংলা নাম কালোজাম। এটি ভারতবর্ষের আদি গাছ। জাম গাছ প্রায় ৬০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। তবে বহু শাখা প্রচুর পাতার কারণে এই গাছ লম্বাটে মনে হয় না। এর বাকল প্রায় ১ ইঞ্চি পুরু হয়। বাকলের রঙ ফিকে ধূসর এবং প্রায় মসৃণ। কাঠের রঙ লালচে বা ধূসর বর্ণের হয়। এই গাছের পাতা গন্ধযুক্ত। কচি পাতা গোলাপি। পাতা বড় হলে তা গাঢ় সবুজ বর্ণের হয়। তবে এর মধ্য শিরা হলদেটে হয়। পাতাগুলো মসৃণ ও চকচকে হয়ে থাকে।মার্চ-এপ্রিলে মাসে এই গাছে ফুল আসে। জামের ফুল গুলো ছোট, সাদা এবং গন্ধযুক্ত। মে-জুন মাসে ফল বড় হয়। ফলটি লম্বাটে ডিম্বাকার। শুরুতে এটি সবুজ থাকে। একটু বড় হলে এর রঙ গোলাপী বর্ণ ধারণ করে। পাকলে কালো বা ঘন কালচে বেগুনি হয়ে যায়। এই ফলের রস বেগুনি। ফলগুলো প্রায় ১ থেকে ১.৫ ইঞ্চি লম্বা হয়। এর ভিতরে একটি লম্বাটে বড় বিচি থাকে। এই গাছ বাংলাদেশ, ভারতের প্রায় সর্বত্র, পাকিস্তান, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কাতে এই গাছ প্রচুর জন্মে। জাম গাছের বীজ, ফল, পাতা ও ছাল বিভিন্ন রোগের ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

সব ধরনের মাটিতে জাম চাষ করা যায়। উচ্চফলনের জন্য সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ মাটি প্রয়োজন। লবণাক্ততা এবং জলমগ্ন জায়গায়ও জাম ভালোভাবে উৎপাদিত হয়। জাম রোপণ সময় মধ্য জ্যৈষ্ঠ-মধ্য ভাদ্র (জুন-আগস্ট)। বীজ এবং অঙ্গজ পদ্ধতিতে বংশবিস্তার করা যায়। বীজে কোনো সুপ্তাবস্থা নেই। টাটকা বীজ বপন করতে হবে।  যা ১০-১৫ দিনের মধ্যে অঙ্কুরিত হয়। গাছ থেকে গাছ ১০ মি. এবং সারি থেকে সারি ১০ মি. দূরত্বে রোপণ করতে হবে এবং গর্ত বা পিটের আকার হবে ১x১x১ মি.।

সেচ :

জাম গাছের মূল মাটির গভীরে থাকে বিধায় মাটির গভীর হতে পানি শোষণ করতে পারে এবং বৃষ্টিহীন অবস্থায়ও ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে। বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য গাছের বৃদ্ধি ও ফুল আসা পর্যায়ে প্রতি বছর ৮-১০টি সেচ দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।

রোগ-পোকামাকড়
সাদা মাছি পোকা : এ পোকা গাছের চারা অবস্থা থেকে পূর্ণ বয়স্ক পর্যন্ত ডগার কচি পাতার রস চুষে খায় এবং আক্রান্ত পাতা কুঁকড়ে যায়। এ পোকা দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি ইমিডাক্লোরপ্রিড (এডমায়ার, টিডো), রগর/টাফগর ২ মিলি স্প্রে করতে হবে।
 
পাতা খাদক শুঁয়াপোকা :

এ পোকা গাছের কচি পাতা খেয়ে পত্র শূন্য করে ফেলে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ এবং প্রতি লিটার পানিতে একতারা ০.২৫ গ্রাম, ডায়মেথোয়েট ৪০ ইসি ১ মিলি. ম্যালাথিয়ন বা এসাটাফ ০.৫-১ গ্রাম মিশিয়ে স্প্রের মাধ্যমে এ পোকা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

অ্যানথ্রাকনোজ :

পাতা, বোঁটা ও পুষ্পমঞ্জরি ও ফলে এ রোগ আক্রমণ করে। পাতায় বাদামি দাগ দেখা যায় এবং আক্রান্ত স্থান কালো হয়ে শুকিয়ে যায়। রোগ দেখা দিলে প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি প্রোপিকোনাজল (টিল্ট) বা ১ গ্রাম কার্বেন্ডাজিম (ব্যাভিস্টিন বা নোইন) বা ২ গ্রাম টপসিন এম বা ২ গ্রাম ডায়থেন এম-৪৫ মিশিয়ে ১০-১২ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে।

ফলন :

গাছ লাগানোর ৮ থেকে ১০ বছর পর ফল ধরা শুরু করে এবং ৫০-৬০ বছর পর্যন্ত ফল দেয়। জুন-জুলাই মাসে ফল পাকে। একটি গাছে ৮০-১০০ কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। 

জামের পুষ্টিগুন :
জামে রয়েছে প্রচুর পরিমানে পুষ্টি।  কারন প্রতি ১০০ গ্রাম জামে রয়েছে শর্করা ১৫.৫৬ গ্রাম, চর্বি  ০.২৩ গ্রাম, আমিষ  ০.৭২ গ্রাম ,পানি ৮৩.১৩ গ্রাম ,থায়ামিন  (ভিটামিন বি১) ০.০০৬ মিলিগ্রাম ০% ,রিবোফ্লাভিন (ভিটামিন বি২) ০.০১২ মিলিগ্রাম ১% ,নিয়াসিন (ভিটামিন বি৩) ০.২৬০ মিলিগ্রাম ২%, প্যান্টোথেনিক এ্যাসিড (বি৫)  ০.১৬০ মিলিগ্রাম ৩%, ভিটামিন বি৬ ০.০৩৮ মিলিগ্রাম ৩%, ভিটামিন সি ১৪.৩ মিলিগ্রাম ২৪%, ক্যালসিয়াম ১৯ মিলিগ্রাম ২%, লৌহ ০.১৯ মিলিগ্রাম ২%, ম্যাগনেশিয়াম ১৫ মিলিগ্রাম ৪%, ফসফরাস ১৭ মিলিগ্রাম ২% , পটাশিয়াম ৭৯ মিলিগ্রাম ২%, সোডিয়াম  ১৪ মিলিগ্রাম ১%।

উপকারিতা :

১। জামের পাতা ও ছালের রস সকালে ও বিকেলে চিনি সহ সেবন করলে অতিসার রোগ নিরাময় হয়।

২। গ্রহনী রোগ হলে জাম গাছের ছালের রসের সাথে ছাগলের দুধ খেলে উপকার পাওয়া যায়।

৩। অতিসার রোগে মলের সঙ্গে রক্ত বের হলে জামের ছাল বেটে মধু ও দুধের সাথে খেলে উপকার পাওয়া যায়।

৪। জাম,আমও আমলকি পাতার রস একএে মধু ও দুধের সাথে মিশিয়ে খেলে আমাশয় ভালো হয়।

৫। অরুচি হলে জাম পাতার রস মিছরির সাথে মিশিয়ে খেলে অরুচি ভাব কেটে যায়।

৬। কচি আম পাতার রস বা ক্বাথ মধুসহ খেলে বমি বন্ধ হয়ে যায়।

৭। জাম গাছের ছাল মিহি গুঁড়ো করে ক্ষতে লাগালে ক্ষত ভালো হয়।

৮। জাম পাতা ও ছালের ক্বাথ তৈরি করে কুলকুচি করলে গলা,মুখ ও জিভের ঘা ভালো হয়ে যায়।

৯। মুখের যে কোন সমস্যা হলে জাম গাছের পাতার রস  গরম করে কুলকুচি করলে উপকার পাওয়া যায়।

১০। জামের বীজ শরবত করে খেলে তৃষ্ণা রোগ নিরাময় হয়।

১১। জামে প্রচুর পরিমানে আয়রন থাকে তাই জাম খেলে রক্ত পরিষ্কার থাকে।

১২। জামে ভিটামিন এ ও সি রয়েছে তাই জাম খেলে চোখ ও ত্বক ভালো থাকে।

১৩। জামে রয়েছে  অ্যাসট্রিনজেন্ট প্রপার্টি থাকার ফলে জাম ত্বক অয়েল ফ্রি রাখে।  এবং মুখের কালো ছোপ দূর হয়।

১৪। জাম নিয়মিত খেলে হার্ট ভালো থাকে।

১৫। জাম রক্তে চিনির মাএা নিয়ন্ত্রনে থাকে তাই জাম খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published.