চালকুমড়ার স্বাস্থ্যগুণ ও চাষপদ্ধতি

6th January 2020 0 Comments



কুমড়া কয়েক রকমের হয়; যেমন- মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, জালিকুমড়া ইত্যাদি। মিষ্টিকুমড়া ফলজাতীয় সবজি যা কিউকারবিটেসি পরিবারের প্রধান গণ কিউকারবিটার কয়েকটি প্রজাতি। মিষ্টিকুমড়ার আকার পেটমোটা গোল এবং পাকা অবস্থায় এর ভিতরের অংশ উজ্জ্বল কমলা বর্ণের হয়ে থাকে। চালকুমড়া বা জালিকুমড়া গণভুক্ত এটি সবুজ রঙের হয়। চাল কুমড়া নানা পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। প্রতি ১০০ গ্রাম চাল কুমড়ায় রয়েছে খাদ্যশক্তি ১৩ কিলোক্যালরি, আমিষ ০.৪ গ্রাম,শর্করা ৩ গ্রাম, ফাইবার ২.৯ গ্রাম,চর্বি ০.২ গ্রাম,ভিটামিন সি ১০.১ মিলিগ্রাম,পটাশিয়াম ১৫০ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ১১ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ২৬ মিলিগ্রাম। আজকের লেখাতে আমরা জানবো চাল কুমড়ার পুষ্টি উপকারীতা গুলো।

চালকুমড়ার জাত


বাংলাদেশে দুই ধরণের কুমড়া দেখা যায়।
ডিম্বাকার জাত
লম্বাটে জাত

এছাড়াও কিছু গুরুত্বপূর্ণ জাত রয়েছে যেগুলোর চাষাবাদ করা হয়।
হাইব্রীড চালকুমড়া – হীরা – ৪৫১
উফ্‌শী চালকুমড়া
চালকুমড়া ভৈরবী
জুপিটার এফ১
পোলস্টার এফ১
দূরন্ত

উপযুক্ত সময়

কুমড়া খরিফ মৌসুমের সবজি। সাধারণত মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত বীজ বপণ করা হয়।

চালকুমড়া চাষ পদ্ধতি


বাড়ির আঙ্গিনায় বা উঠোনে অথবা বাড়ির ছাদে এই কুমড়ার চাষ করা যায়। আমাদের দেশে প্রায় সবধরণের মাটিতে চাল কুমড়ার চাষ করা যায়। তবে দো-আঁশ ও এটেল দো-আঁশ মাটিতে  কুমড়ার চাষ করা যায়। কুমড়া চাষের জন্য মাঝারি অথবা বড় সাইজের মাটির টব ব্যবহার করা হয় এছাড়াও হাফ সাইজের ড্রাম ব্যবহার করা যেতে পারে।
কুমড়ার চারা লাগানোর ক্ষেত্রে প্রতিটি পাত্রে ৫-৬ টি করে বীজ বপন করতে হবে। এরপর যখন বীজ থেকে চারা উৎপাদিত হবে তখন প্রতিটি টবে সবল সুস্থ্য চারা রেখে দুর্বল চারা উপড়ে ফেলতে হবে।  চারা গজানোর পর প্রথম দিকে নিয়মিত পানি দিতে হবে এবং পরবর্তীতে অতিরিক্ত গরম পড়লে বেশী পানি দিতে হবে। শীতকালীন চাষের সময় জমিতে রসের পরিমাণ কম থাকলে প্রয়োজনে জমি চাষের আগে সেচ দিয়ে নিতে হবে। 

চালকুমড়ার যত্ন-আত্তি


যেহেতু কুমড়া বর্ষজীবী লতানো উদ্ভিদ তাই কুমড়ার গাছের চারা একটু বড় হলে একটা ছোট লাঠি অথবা বাঁশ দিয়ে গাছকে বেঁধে দিতে হবে। এরপর যত্ন সহকারে মাচা তৈরি করে দিতে হবে। খেয়াল রাখবেন কুমড়া গাছে ফুল ধরার সময় হলে প্রথমে গাছে প্রচুর পরিমাণে পুরুষ ফুল আসে। পাশাপাশি স্ত্রী ফুলও জন্মায়। কুমড়ার পরাগায়ন সাধারণত কীটপতঙ্গ ও মৌমাছির দ্বারা সম্পন্ন হয়। কিন্তু যদি মৌমাছি দ্বারা পরাগায়ন না হয় তাহলে নিজেই পরাগয়ন করে দেয়া যায়। এক্ষেত্রে যা করতে হবে- পুরুষ ফুলের পরাগধানীতে পরাগরেণু স্ত্রী ফুলের গর্ভমুন্ডে স্থানান্তরিত হতে হবে এবং তাতেই ফল ধারণ করবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে  পরাগায়ন যেন সঠিক ভাবে হয়।

চালকুমড়ার ফলনে প্রয়োজনীয় সার
কুমড়া গাছে সবসময় বাড়িতে তৈরি জৈব সার দেয়া উচিত। যেমন তরকারীর খোসা, ময়লা আবর্জনা, হাস-মুরগীর বিষ্ঠা, কাঠ-কয়লা-ছাই ইত্যাদি। এছাড়াও অজৈব সার হিসেবে ইউরিয়া, টিএসপি, মিউরেট অব পটাশ,  জিপসাম,  জিংক অক্সাইড ইত্যাদি দেয়া যায়।

চালকুমড়ার পোকা ও এর দমন
ফলের মাছি পোকা – এ পোকার লার্ভা ফল ছিদ্র করে ভিতরে ঢুকে ভিতরের অংশ খেয়ে ফেলে।
লাল কুমড়া বিটল – এ পোকা চারা গাছের জন্য ক্ষতিকর।
ইপিল্যাকনা বিটল – পাতার সবুজ অংশ খেয়ে শুধু পাতার শিরা বাদ রেখে দেয়।ফলে গাছের পাতা শুকিয়ে মরে যায়।
লাল মাকড় – এক ধরণের ছোট মাকড় যা পাতার নিচে থাকে এবং পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে।
পোকা দমনের জন্য সেভিন কিংবা নেক্সিয়ন এবং ডায়াজিনন এর স্প্রে করা হয়।
কুমড়া চাষের অন্যতম প্রধান শত্রু “মাছি”। চালকুমড়ার ফুলে ও ফলে এই পোকা বসলে ফল লাল হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কুমড়া ঝড়ে পড়ে। এই পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করা হয়, পোকা দেখা মাত্র মেরে ফেলা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করা,  পোকা মারার ফাঁদ তৈরি করা এবং  বিষটোপ ব্যবহার করা।

চালকুমড়ার রোগ ও এর দমন


পাউডারি মিলডিউ – পাতার উপর সাদা পাউডারের মতো দেখা যায় যা পাতা নষ্ট করে দেয়। এর জন্য সুক্ষ্ণ গন্ধক চূর্ণ ডাষ্টিং, ফার্মেট স্প্রে অথবা কিউপ্রাসাইড, ক্যারাথেন প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়।
ডাউনি মিলডিউ – পাতার নিচে ধূসর বেগুনী রং ধারণ করে ফলে গাছ দূর্বল হয়ে মরে যায়। এর জন্য বোর্দো – মিক্সচার স্প্রে কিংবা এক ভাগ তুতেঁ ও চার ভাগ চূণাযুক্ত ডাষ্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।

ফসল সংগ্রহ
বীজ বপণের ২-৩ মাসের পর থেকে ফসল সংগ্রহ শুরু করা যায়। চালকুমড়া সবজি হিসেবে খেতে হলে সবুজ হুল যুক্ত ৪০০-৬০০ গ্রাম হলে তুলতে হবে। মোরব্বা বা বড়ি দেওয়ার জন্য পরিপক্ক করে ১২০-১৩০ দিন পর তুলতে হবে।

চাল কুমড়ার পুষ্টি উপকারীতা


(১) চাল কুমড়া এন্টি মাইক্রোবিয়াল এজেন্ট হিসাবে পেট এবং অন্ত্রের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া দূর করতে সাহায্য করে। এটি গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ইনফেকশন বা আলসার রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এটি মসলাযুক্ত খাবার বা দীর্ঘদিনের জন্য উপবাসের কারণে পাকস্থলিতে তৈরি হওয়া এসিড দূর করতে সাহায্য করে।

(২) চাল কুমড়া শরীরের ওজন ও মেদ কমাতে অনেক উপকারি একটি সবজি। এটি রক্ত নালীতে রক্ত চলাচল সহজতর করে। চাল কুমড়া অধিক ক্যালরি যুক্ত খাবারের বিকল্প হিসেবেও খাওয়া যায়।

(৩) চাল কুমড়া মানসিক রোগীদের জন্য পথ্য হিসেবে কাজ করে, কারন এটি ব্রেইন এর নার্ভ ঠাণ্ডা রাখে। এই জন্য চাল কুমড়াকে ব্রেইন ফুড বলা হয়।

(৪) প্রতিদিন চাল কুমড়ার রস খেলে যক্ষ্মা রোগের উপসর্গ কেটে যায়। চাল কুমড়া রক্তপাত বন্ধ করতে সাহায্য করে, যাদের কাশের সঙ্গে রক্ত বের হয়, এমন ক্ষেত্রে চাল কুমড়ার রস খেলে ভালো হয়ে যায়। এতে রক্ত বের হওয়া থেমে যায়।

(৫) মুখের ত্বক এবং চুলের যত্নেও চাল কুমড়ার রস অনেক সাহায্য করে। চাল কুমড়ার রস নিয়মিত চুল ও ত্বকে মাখলে চুল চকচকে হয় এবং ত্বক সুন্দর হয়, বয়সের ছাপ প্রতিরোধ করতেও চাল কুমড়া সাহায্য করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published.