আধুনিক পদ্ধতিতে টমেটো চাষ

টমেটো চাষ
24th September 2019 0 Comments

সারা বিশ্বে আলুর পরই টমেটো উৎপন্ন হয়। অধিকাংশ দেশেই টমেটো অন্যতম প্রধান সবজি। টমেটো কাঁচা, পাকা এবং রান্না করে খাওয়া হয়। প্রতি মৌসুমে বিপুল পরিমাণ টমেটো সস, কেচাপ, চাটনি, জুস, পেষ্ট, পাউডার ইত্যাদি তৈরিতে ব্যহৃত হয়। টমেটোর কদর মূলত ভিটামিন-সি এর জন্য। তবে এর রঙ, রূপ ও স্বাদও অনেককে আকৃষ্ট করে। সালাদ হিসেইরে অধিকাংশ টমেটো খাওয়া হয়।

টমেটোর জাতঃ

আমাদের দেশে চাষ করার মত টমেটোর অনেক জাত রয়েছে। তবে মৌসুম অনুসারে টমেটোর জাতকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়ছে। এরমধ্যে আগাম জনপ্রিয় জাতসমূহ হলোঃ বারি টমেটো ৪, বারি টমেটো ৫ ইত্যাদি। টমেটোর নাবি মৌসুমি জাতসমূহ হলোঃ বাহার, রোমা ভিএফ, সুরক্ষা, রাজা ইত্যাদি। মাঝ মৌসুমি জাতসমূহ হল মানিক, মহুয়া, রতন, বারি টমেটো-৩, বারি টমেটো-৬, , বারি টমেটো-৭, , বারি টমেটো-৯ ইত্যাদি। এছাড়াও গ্রীষ্মকালীন কিছু টমেটোর জাত রয়েছে। তাঁর মধ্যে রয়েছে শ্রাবণী, বারি টমেটো-৪, বারি টমেটো-১০ ইত্যাদি। এছাড়াও অন্যান্য জাতের মধ্যে রয়েছে হীরা, মারগ্লোব, রূপালি, সাথী, সবল, মিন্টু, লাভলী, ডেলট ইত্যাদি।

টমেটো চাষের জন্য জলবায়ুঃ

টমেটো এদেশে রবি বা শীতের ফসল হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট  থেকে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। রাতের তাপমাত্রা ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর নিচে থাকলে তা গাছের ফুল ও ফল ধারণের জন্য বেশি উপযোগী। গড় তাপমাত্রা ২০-২৫ ডিগ্রি সে. টমেটোর ভালো ফলনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। রাতের তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর কম হলে টমেটোতে ফল হয় না।

মাটির বৈশিষ্ট্যঃ

আলো-বাতাসযুক্ত উর্বর দো-আঁশ মাটি টমেটো চাষের জন্য সবচেয়ে ভালো। তবে উপযুক্ত পরিচর্যা বেলে দো-আঁশ থেকে এঁটেল দো-আঁশ সব মাটিতেই টমেটোর ভালো জন্মে। মাটির অম্লতা ৬-৭ হলে ভালো হয়। মাটির অম্লতা বেশি হলে জমিতে চুন প্রয়োগ করা দরকার।

বীজতলা তৈরিঃ

চারা তৈরির দুই মাস আগে বীজ বপনের জন্য বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি নিতে হবে। বীজতলায় নির্দিষ্ট পরিমাণ জৈব সার এবং রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করতে হবে।

বীজতলায় বীজ বপনঃ

বীজ বোনার আগে  প্রোভক্স/ব্যাভিস্টিন বা ভিটাভ্যাক্স বা সিনকার দ্বারা বীজ শোধন করে নিতে হবে। সুস্থ সবল চারা উৎপাদনের জন্য প্রথমে ১০ গ্রাম মানসম্মত ভাল বীজ ঘন করে প্রতিটি বীজতলায় (বীজ তলার আয়তন হবে দৈর্ঘ্য ১ মিটার ও প্রস্থ ৩ মিটার) বুনতে হয়। সুস্থ সবল ও ভাইরাসমুক্ত চারা রোপণ করে ভালো ফলন পাওয়া যায়।অতিরিক্ত বৃষ্টি ও রোদের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজনে পলিথিন ও চাটাই এর আচ্ছাদন ব্যবহার করা দরকার ।

বীজের পরিমাণঃ

বীজতলায় বীজ বপনের ক্ষেত্রে শতাংশ জমি প্রতি ১ গ্রাম (২০০ গ্রাম/হেক্টর) বীজ লাগে। তবে জাত ভেদে বীজের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে।

সার প্রয়োগ পদ্ধতিঃ

ইউরিয়া ও এমওপি সার ব্যতীত বাকি সব সার মূলজমি তৈরির সময় প্রয়োগ করতে হবে এবং মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে ফেলতে হবে। তবে দস্তা ও টিএসপি এক সাথে প্রয়োগ করা উচিত নয়। ইউরিয়া ও এমওপি সার সমান তিন ভাগে ভাগ করে তিনবারে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম ভাগ চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পর, দ্বিতীয় ভাগ চারা রোপণের ২৫-৩০ দিন পর, তৃতীয় ভাগ চারা রোপণের ৪০-৪৫ দিন পর উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

চারা রোপণঃ

চারার বয়স ২৫-৩০ দিন অথবা ৪-৬ পাতা হলে মূল জমিতে রোপণ করতে হবে।বীজতলা থেকে চারা অত্যন্ত যতœ সহকারে তুলতে হবে যাতে চারা শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এ জন্য চারা তোলার আগে বীজতলার মাটি ভিজিয়ে নিতে হবে।চারা রোপণের আগে উপড়ে তোলা চারাগাছটির গোড়া (শিকড়) ২% ইউরিয়া +২% বোরিক এসিড দ্রবণে ডুবিয়ে নিলে চারা গাছটি তাৎক্ষণিকভাবে খাবার পায়। ফলে পাতা হলুদ বা বিবর্ণ হবে না।প্রথমে ১ মিটার চওড়া বেড তৈরি করে নিতে হবে। প্রতি বেডে দুই লাইন করে চারা রোপণ করতে হবে। লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব হবে ৬০ সেমি. এবং প্রতি লাইনে চারা থেকে চারা ৬০ সেমি. দূরত্বে লাগাতে হবে।একটি বেডে দুই লাইনে টমেটোর চারা রোপণ করার ক্ষেত্রে চারাগুলো ত্রিভূজ আকৃতিতে লাগাতে হবে।বিকেলের পড়ন্ত রোদে চারা রোপণ করাই উত্তম এবং লাগানোর পর গোড়ায় হালকা সেচ প্রদান করতে হবে।

সেচ ও নিষ্কাশনঃ

চারা রোপণের ৩-৪ দিন পর পর্যন্ত হালকা সেচ ও পরে প্রতি কিস্তিতে সার উপরি প্রয়োগের পর জমিতে সেচ দিতে হয়। গ্রীষ্ম মৌসুমে টমেটো চাষের জন্য ঘন ঘন সেচের প্রয়োজন হয়। বর্ষা মৌসুমে তেমন একটা সেচের প্রয়োজন হয় না। টমেটো গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তাই সেচ দেওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে, সেচের পানি কখনোই যেন বেডের উপর উঠে না আসে। নালাতে সেচ দিতে হবে, নালা থেকে শোষণের মাধ্যমে বেড ও গাছ পানি সংগ্রহ করতে হবে।

আচ্ছাদনের বাবস্থাঃ

সূর্যের প্রখরতা থেকে চারা গাছকে বাঁচানোর জন্য ছায়াদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

মালচিংঃ

প্রতিটি সেচের পরে মাটির উপরি ভাগের চটা বা চাকামাটি ভেঙে দিতে হবে যাতে মাটিতে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করতে পারে।

আগাছা দমনঃ

 

টমেটোর জমিতে প্রয়োজনীয় নিড়ানি দিয়ে আগাছামুক্ত রাখতে হবে।

বিশেষ পরিচর্যাঃ

  • প্রথম ফুলের গোছার ঠিক নিচের কুশিটি ছাড়া নিচের সব পার্শ্বকুশি ছেঁেট দিতে হবে।
  • বাউনিয়া দেয়া-গাছে বাঁশের খুঁটি দিয়ে ঠেকনা দিতে হবে।

ফসল তোলাঃ

  • ফলের নিচে ফুল ঝরে যাওয়ার পর যে দাগ থাকে ঐ স্থান থেকে লালচে ভাব শুরু হলেই বাজারজাতকরণের জন্য ফল সংগ্রহ করতে হবে। এতে ফল অনেকদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।
  • অপরিপক্ব অবস্থায় ফল তুলে হরমোন প্রয়োগে ফল পাকানো হলে ফলের স্বাভাবিক স্বাদ ও পুষ্টিগুণ নষ্ট হয় এবং ফলনও কম হয়। তাই এভাবে ফলন সংগ্রহ ও পাকানো মোটেই সমীচিন নয়।

মেয়াদঃ ১০০-১৪০ দিন।

 

ফলনঃ

জাত ভেদে ফলন ১৫-৫০ টন/একর হয়। মৌসুম, জাত, আবহাওয়া এবং পরিচর্যা অনুযায়ী প্রতি একর জমিতে ৫০ টনের বেশি টমেটো পাওয়া সম্ভব।

অনলাইনে বীজ কোথায় পাওয়া যায়ঃ

দোকানের পাশাপাশি এখন অনলাইনে বীজ কিনতে পারবেন। কিনতে নিচে বীজ লেখা লিঙ্কের উপর ক্লিক করুনঃ

বীজ

 

Leave a Comment

Your email address will not be published.